April 8, 2026, 11:01 am

দৈনিক কুষ্টিয়া অনলাইন/
দেশের জ্বালানি খাতে এক ধরনের নীরব সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) আমদানি বাড়লেও সেই সুফল পৌঁছাচ্ছে না মাঠপর্যায়ে। সরবরাহ ঘাটতির কারণে ইতোমধ্যে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ এলপিজি ফিলিং স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। আর চালু থাকা প্রায় ৭০ শতাংশ স্টেশনও পূর্ণ সক্ষমতায় জ্বালানি দিতে পারছে না; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সীমিত সরবরাহে চলছে কার্যক্রম। ফলে বাস্তবে জ্বালানি প্রাপ্যতা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে একই চিত্র—স্টেশনে তেল নেই, তবু গাড়ির দীর্ঘ সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক খালি হাতে ফিরছেন। এলপিজিচালিত যানবাহনের চালকদের জন্য এই সংকট সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ অটোগ্যাসচালিত যানবাহন রয়েছে। এসব যানবাহনের চালকরা প্রয়োজনীয় গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে সিএনজি বা অকটেনের মতো বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছেন। এতে অন্যান্য জ্বালানির ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও অস্থির করে তুলছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে প্রায় ৩০টি এলপিজি অপারেটর থাকলেও বর্তমানে মাত্র ছয় থেকে সাতটি প্রতিষ্ঠান নিয়মিত আমদানি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ স্টেশন প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছে না। যেসব স্টেশন নির্দিষ্ট সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল, তারা সরবরাহ না পেয়ে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। আবার অনেক স্টেশন সীমিত গ্যাস পেয়ে আংশিকভাবে চালু থাকলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল।
এ সংকটের বহুমাত্রিক প্রভাব পড়ছে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে। একদিকে স্টেশন মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন—খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, প্রায় ৮০ শতাংশ স্টেশন লোকসানে চলছে। অন্যদিকে ভোক্তারা জ্বালানি পরিবর্তন ও অতিরিক্ত মূল্যের কারণে বাড়তি ব্যয় বহন করতে বাধ্য হচ্ছেন। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগও রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমদানির পরিসংখ্যান সংকটের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, মার্চ মাসে দেশে প্রায় দুই লাখ ১১ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। তবুও বাজারে এর প্রতিফলন নেই। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, ডিলার পর্যায়ে মজুদদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এই বৈপরীত্যের মূল কারণ।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও এলপিজির দাম বেড়েছে, যা দেশের বাজারে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে জাহাজভাড়া বৃদ্ধিও আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে এলপিজির দাম বেড়ে ভোক্তা পর্যায়ে নতুন করে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি গৃহস্থালি খরচও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার ‘ফুয়েল পাস’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানো যায় এবং জ্বালানি বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানি, মজুদ বৃদ্ধি এবং বাজার তদারকি জোরদারের কথাও বলা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।
সব মিলিয়ে, সংখ্যার হিসেবে ৭০ শতাংশ স্টেশন চালু থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন—সীমিত সরবরাহের কারণে কার্যকরভাবে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে এই সংকট এখন আর কেবল একটি খাতের সমস্যা নয়; এটি পরিবহন ব্যবস্থা, ভোক্তা ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে জ্বালানি খাতের এই অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।